দিল্লির রাস্তায় ‘স্টেপ ডাউন ইউনুস’: দক্ষিণ এশিয়ার নতুন রাজনৈতিক বার্তা?

দিল্লির রাস্তায় ‘স্টেপ ডাউন ইউনুস’: দক্ষিণ এশিয়ার নতুন রাজনৈতিক বার্তা?
দিল্লির রাস্তায় ঝুলে থাকা ব্যানারগুলোর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন জনমনে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছে—কেন ভারতের রাজধানীর সড়কজুড়ে একজন বাংলাদেশি নাগরিককে লক্ষ্য করে রাজনৈতিক বার্তার মতো পোস্টার ঝুলছে? রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সফরকে কেন্দ্র করে যখন দিল্লি স্বাভাবিকভাবেই কূটনৈতিক তৎপরতায় ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় এ ধরনের ব্যানার যেন ঘটনাটিকে রাজনৈতিক ও কৌতূহলময় মাত্রা দিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে পোস্টারের বার্তা—Step Down Younus—যা কোনো ভারতীয় রাজনীতিবিদকে নয়, বরং বাংলাদেশের একজন নোবেলজয়ী নাগরিককে উদ্দেশ্য করে লেখা।
এমন দৃশ্য ভারতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সম্পূর্ণ নতুন নয়, তবে এবারের বিষয়টি ভিন্নতর এবং ব্যতিক্রমী। কারণ এখানে বার্তাটি একজন এমন ব্যক্তিকে নিয়ে, যিনি ভারতের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন, কিংবা ভারতীয় কোনো নীতি-নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অংশীও নন। তাহলে কেন দিল্লির রাস্তায় তার নাম উচ্চারণ করে প্রতিবাদ বা প্রচার চালানো হলো? প্রশ্নটি যত সহজ মনে হয়, এর অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার জটিল কূটনীতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, এবং সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।
প্রথমত, এটিকে ভারত সরকারের অবস্থান ভেবে নেওয়া সম্পূর্ণ ভুল। কোনো দেশের রাজধানী শহরে রাষ্ট্রীয় সফরের সময় বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের মতামত, প্রতিবাদ বা প্রচারণা চালায়—এটি একটি বহুল পরিচিত বিষয়। দিল্লি তো বটেই, ওয়াশিংটন, লন্ডন, ব্রাসেলস, এমনকি জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে প্রতিদিনই নানা আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে ব্যানার, প্ল্যাকার্ড আর রাজনৈতিক বার্তা দেখা যায়। তাই দিল্লির পোস্টারকে ভারতের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা রাজনৈতিক অজ্ঞতা ছাড়া কিছু নয়। এগুলো বরং, ন্যূনতমভাবে “ফ্রিঞ্জ গ্রুপ”—বা প্রান্তিক সঙ্ঘের—একটি প্রচারণার অংশ, কিংবা বৃহত্তর রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ হিসেবে বিদেশি সফরকে ব্যবহার করার প্রচেষ্টা।
তবে প্রশ্নটি এখানেই শেষ হয় না। ড. মুহাম্মদ ইউনুস এমন কোনো ব্যক্তি নন, যে শুধু বাংলাদেশে পরিচিত। তিনি নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন নীতির একজন স্বীকৃত চিন্তাবিদ, এবং বিশ্বব্যাপী দাতব্য ও অর্থনৈতিক উদ্যোগের একটি মুখ। পশ্চিমা বিশ্বে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে তার গ্রহণযোগ্যতা বিস্তৃত। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই তার নাম নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক উত্তাপ বহুদিন ধরেই আলোচনায়—কেউ তাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ইতিবাচক প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখে, আবার কেউ তাকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাবশালী শক্তির প্রতিনিধি বা সমর্থিত চরিত্র হিসেবে সমালোচনা করে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচিত হওয়ার পর থেকে ড. ইউনুসকে ঘিরে নানা ব্যাখ্যা, অভিযোগ, প্রচারণা এবং পাল্টা প্রচারণা বেড়েছে। কেউ তাকে ‘পশ্চিমা ব্লকের প্রিয়মুখ’ বলে মনে করেন, আবার অনেকে মনে করেন তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় সক্রিয় কোনো খেলোয়াড় নন বরং একজন বেসরকারি উন্নয়নকর্মী ও বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের অংশ। কিন্তু রাজনীতির প্রকৃতি এমন যে—যে বিষয়টা যতটা সরল, বাস্তব চিত্রটি ততটাই জটিল। তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই ঘূর্ণাবর্তে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে, ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নাম আর তার ভূমিকা অনেক বেশি আলোচিত হয়ে উঠেছে।
দিল্লির পোস্টারগুলো দেখার পর আরেকটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে—এটি কি কাকতালীয়, নাকি সুচিন্তিত প্রচেষ্টা? রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন যখন ভারতের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও কৌশলগত আলোচনা করতে যাচ্ছেন, তখন ভারতের রাজধানীতে ড. ইউনুসকে নিয়ে পোস্টার ঝুলে থাকা নিছক কোনো শৌখিন প্রতিবাদ নয়। বরং এটি এক ধরনের আন্তর্জাতিক বার্তা। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি, তার প্রভাবশালী প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান, পশ্চিমা বিশ্ব—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান—এবং এশিয়ার শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা—এসবের ভেতরেই এই পোস্টারের ব্যাখ্যা খুঁজতে হয়।
এ ধরনের পোস্টার তুলে ধরা হতে পারে ভারতের অভ্যন্তরীণ কিছু গোষ্ঠী বা ‘থিংক ট্যাংকের’ আগ্রহ থেকেও। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ক্রমশ আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বীর ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশ—তার ভূগোলগত গুরুত্ব, বন্দর ও জ্বালানি রুট, কৌশলগত অবস্থান এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণে—প্রত্যেকেই নজর রাখছে। ড. মুহাম্মদ ইউনুস যেহেতু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী একটি নাম, তাই তার ইমেজ বা অবস্থান নিয়ে কোনো পক্ষ প্রচারণা চালালে সেটি খুব সহজেই আলোচনায় উঠে আসে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও টেনে আনে। ফলে দিল্লির পোস্টারকাণ্ডকে শুধু স্থানীয় কোনো আন্দোলন হিসেবে দেখা হলে ভুল হবে; বরং এটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রতিফলন হিসেবেও ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—দিল্লি একটি উন্মুক্ত রাজনৈতিক শহর। যে কেউ আইনগত সীমার মধ্যে থেকে পোস্টার লাগাতে পারে। সুতরাং যে গোষ্ঠীই এটি করে থাকুক না কেন, তাদের উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর কাড়ার লক্ষ্যেই ছিল। পোস্টারের ভাষা স্পষ্ট—Step Down Younus—অর্থাৎ পদত্যাগ করুন। এটি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দাবি। কিন্তু কাদের দাবি? তাদের পরিচয় কী? তারা কি বাংলাদেশি কোনো প্রবাসী গোষ্ঠী? নাকি ভারতীয় কোনো রাজনৈতিক দল? কেউই এখনো পরিষ্কার না হলেও, তাদের উদ্দেশ্যটি অত্যন্ত পরিষ্কার—বাংলাদেশের রাজনীতির চলমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ড. ইউনুসের নামকে দাঁড় করানো।
এখানে এটাও লক্ষণীয় যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফর কিংবা রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার সময় এমন পোস্টার সাধারণত পুরোপুরি উপেক্ষিত থাকে। কিন্তু পুতিনের সফরকে কেন্দ্র করে এটি আলোচনায় এসেছে। রাশিয়া, ভারত এবং পশ্চিমা বিশ্বের কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের ভেতর, বাংলাদেশ সম্পর্কিত রাজনৈতিক বার্তা উত্থাপন করার জন্য এটি একটি আদর্শ সময় বলে বিবেচিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক সফরের মুহূর্তগুলোতে শহরগুলো সংবাদমাধ্যমের কেন্দ্রে থাকে, ফলে ছোট্ট একটি পোস্টারও বড় আন্তর্জাতিক আলোচনায় রূপ নিতে পারে। দিল্লির ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই হয়েছে।
আবার এটিও সত্য—ড. মুহাম্মদ ইউনুস নিয়ে প্রচারণা কোনো নতুন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, মামলা, বিরোধী অবস্থান, সমালোচনা এবং পাল্টা সমালোচনা বহুদিন ধরেই চলছে। কিন্তু দিল্লির রাস্তায় তার নাম দেখে জন্ম নেয় নতুন প্রশ্ন: একজন বিদেশি নাগরিক, যিনি ভারতের রাজনৈতিক মঞ্চের কেউ নন, তাকে লক্ষ্য করে বার্তা কেন? এর উত্তর পাওয়া যায় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক পরিবেশে। বাংলাদেশ এই মুহূর্তে যেহেতু পরিবর্তনশীল এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাই এ অঞ্চলের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোও বিষয়টিকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ফলে যেকোনো রাজনৈতিক প্রতীক বা বার্তা—যত ছোটই হোক—তাকে আন্তর্জাতিক পড়াশোনার অংশ হিসেবে দেখাই স্বাভাবিক।
আরেকটি ব্যাখ্যা হলো—এটি হয়তো প্রতীকী। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে প্রতীক বা সিম্বোলিজম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির নাম, ছবি, স্লোগান—এসবই রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। আবার কখনো কখনো প্রতীকী বার্তা দিয়ে কোনো গোষ্ঠী তাদের বৃহত্তর উদ্বেগকে প্রকাশ করে। দিল্লির পোস্টারও হয়তো সেই প্রতীকী প্রতিবাদের অংশ—যেখানে ড. ইউনুসের নাম ব্যবহার করে বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক বিরোধকে সামনে আনা হয়েছে।
সবশেষে, এসব পোস্টার ঝুলানোর মধ্য দিয়ে একটি বড় বাস্তবতা স্পষ্ট হয়—দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এখন আর জাতীয় সীমারেখায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি ক্রমশ আন্তর্জাতিক চরিত্র ধারণ করছে। বাংলাদেশ—যা একসময় তুলনামূলকভাবে সীমিত আলোচনা বা আগ্রহের বিষয় ছিল—এখন হয়ে উঠেছে বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় কৌশলগত সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে কেন্দ্র করে ভারতেও প্রতীকী বার্তা ছড়ানো হচ্ছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনুস ভারতের রাজনীতিতে কোনো ভূমিকায় নেই—এটি সত্য। কিন্তু তার নাম এখন এমন এক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতীকে রূপ নিয়েছে, যার প্রতিক্রিয়া দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়ছে। দিল্লির রাস্তায় তার নাম দেখা তাই নিছক কাকতালীয় নয়—এটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন।
এ কারণে প্রশ্নটি এখন আর শুধু ড. ইউনুসকে লক্ষ্য করে নয়, বরং সমগ্র অঞ্চলের রাজনৈতিক স্রোতধারাকে ঘিরে—একজন বিদেশি নাগরিকের নাম দিল্লির রাস্তায় টাঙানো পোস্টারে উঠে আসে কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই স্পষ্ট হয়, দক্ষিণ এশিয়া আজ এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে স্থানীয় রাজনীতি, আঞ্চলিক প্রভাব, আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং বৈশ্বিক শক্তিসমূহের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মিলেমিশে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপট গড়ে তুলছে। এবং সেই চিত্রটিকে বোঝার জন্য দিল্লির একটি পোস্টারই যথেষ্ট—যা বলে দেয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল, আন্তঃসম্পর্কিত এবং প্রতীক-নির্ভর।
এই কারণেই, দিল্লির রাস্তায় “Step Down Younus” লেখা পোস্টার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল ক্ষমতারধারার এক নিঃশব্দ প্রতিফলন।
আবুল কালাম আজাদ
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ও কলামিষ্ট

 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

SHARES

ফেসবুকে অনুসরণ করুন

আরো পোস্টঃ

ভোলা–বরিশাল সেতু: “আর অপেক্ষা নয়, এখন সময় বাস্তব পদক্ষেপের” — প্রকৌশলী আসফি রায়হান

ভোলা–বরিশাল সেতুর প্রয়োজনীয়তা আজ আর কাউকে নতুন করে বোঝানোর প্রয়োজন নেই—এমন মন্তব্য করেছেন ভোলার লালমোহনের সন্তান, প্রকৌশলী আসফি রায়হান। এক

Read More

উদ্বোধনী দিনে রিকশাচালক ভাইদের অভূতপূর্ব আনন্দ-জোয়ার দেখল আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন অডিটোরিয়াম।

নিজস্ব প্রতিবেদক উদ্বোধনী দিনে রিকশাচালক ভাইদের অভূতপূর্ব আনন্দ-জোয়ার দেখল আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন অডিটোরিয়াম। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী আজ অর্ধদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হলো রিকশাচালকদের জীবনমান

Read More
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x